আন্দুলের অতীত ঐতিহ্য
- Suchorita Kanrar
- Nov 20
- 7 min read
Updated: Nov 22
ভুমিকা
পূর্বের পারীন্দ্র অর্থাৎ আজকের আন্দুল হল হাওড়া জেলার এক প্রচীন বর্ধিষ্ণু জনপদ। হাওড়ার সমস্ত বৈশিষ্ট্যই প্রায় এখানে পরিলক্ষিত হয়। তাই এখানে হাওড়া সম্পর্কে সামান্য একটু আলোচনা প্রয়োজন। বিভিন্ন গবেষণা তথ্য ও প্রমাণাদিতে জানা যায়, আজকের হাওড়া জেলা প্রচীনকালের 'লাঢ়' (রাঢ়) সূক্ষ্ম বা তাম্রলিপ্ত জনপদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। খৃষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকে জৈনধর্মগ্রন্থ ‘আচারাঙ্গ সুত্তে’ তার্থঙ্কর মহাবীরের ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে 'লাঢ়' দেশের 'বজ্জ' ও ‘সুব্ব ভুমিতে’ পরিভ্রমণের কথা বর্ণিত আছে। আচারাঙ্গসুত্তের সেই লাঢ় ভূমিই বর্তমানের রাঢ় বলে প্রমাণিত হয়েছে। আর বজ্জভূমি বলতে পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম সীমান্তে কংকরময় এলাকাকে বোঝায়। এর মধ্যে পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর প্রভৃতি জেলা অন্তর্গত। অপরপক্ষে সুব্বভূমি বলতে পূর্ব মেদিনীপুর, হাওড়া, বর্ধমান জেলাকে বোঝায়। এই সুহ্মভূমির নাম আচারাঙ্গ সুত্ত ছাড়াও জৈন ধর্মগ্রন্থ ‘কল্পসুত্র’ বা ‘ভগবতী সূত্র’তেও উল্লেখ রয়েছে। আবার বৌদ্ধদের জাতকের গল্পে সুহ্ম এর অন্তর্গত দেশক নামে যে নগরের কথা আছে, তা পরবর্তী কালে 'সংযুক্ত নিকায়'তে ‘সেতক’ 'সেধক' নামের উল্লেখ রয়েছে। আনুমানিক খ্রষ্টীয় পঞ্চম শতকে লেখা 'রঘুবংশ' কাব্যে রঘুর দিগ্বিজয়ের প্রসঙ্গে সুহ্মবাসীদের পরাজয়ের কথা বলা হয়েছে। বরাহমিহিরের 'বৃহৎসংহিতায়' এবং সমসাময়িক গ্রন্থ 'মার্কণ্ডেয় পুরাণে' ও উল্লেখ রয়েছে। লক্ষ্মণ সেনের সভাকবি দ্বাদশ শতকের লেখা ধোয়ীর 'পবনদূতে’ গঙ্গার তীরবর্তীস্থনে সুহ্মের অবস্থানের কথা বলা হয়েছে। ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায় 'বাঙালীর ইতিহাস' গ্রন্থে লিখেছেন, 'গঙ্গাভাগীরথীর পশ্চিম তীরবর্তী ভূখণ্ড অর্থাৎ বর্ধমান, হুগলী ও হাওড়া জেলার অধিকাংশ এর মধ্যে পড়ে।' ঐতিহাসিক প্রবোধ চন্দ্র সেনের মতে আজকের হাওড়া জেলার এক বৃহৎ অংশ সুক্ষের অন্তর্ভুক্ত ছিল। শশীভূষণ চৌধুরীও বলেছেন, "প্রাচীন কালের রাঢ় দেশের যে অংশ সুক্ষ নামে পরিচিত ছিল তা সম্ভবত রাঢ়ের দক্ষিণাংশ, বর্তমানের হাওড়া ও পূর্ব মেদিনীপুরকে সূচিত করে।’ নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায় ৯১৩ শতকে পাণ্ডুদাশের সভাকবি শ্রীধর ভট্টাচাল গ্রন্থে লিখেছেন।-
'আসীদ্দক্ষিণরাঢ়ায়ং দ্বিজানাং ভূরিকর্মণাং।
ভূরিসৃষ্টিরিতি গ্রামো ভূরিশ্রেষ্ঠিজনাশ্রয়াঃ ॥'
অর্থাৎ দক্ষিণ রাঢ়ের অন্তর্গত ভূরিশ্রেষ্ঠ গ্রামে বর্ধিষ্ণু বণিক সম্প্রদায়ের বাস ছিল। এই ভূরিশ্রেষ্ঠি গ্রামই যে হাওড়া জেলার ডিহিভূরসুট গ্রাম তাতে কোন সন্দেহ নেই। খৃষ্টীয় একাদশ শতকের চান্দেলরাজ কীর্তিবর্মার সভাকবি কৃষ্ণদাস মিশ্রের প্রবোধ চন্দ্রোদয় নাটকেও ভূরিশ্রেষ্ঠি জনপদের উল্লেখ রয়েছে। এটিই সেই ডিহিভূরসুট গ্রাম।
তবে এই স্থানটির নাম সুহ্মদেশ হল কেন? সে উত্তরে বলা যায়, পুরাকালে যযাতির বংশে-বলি নামে এক ক্ষত্রিয় রাজা ছিলেন। তিনি ছিলেন অপুত্রক। গঙ্গায় স্নান করার সময় তিনি এক বৃদ্ধ ঋষিকে জলের স্রোতে ভেসে যেতে দেখেন। দয়াপরবশ হয়ে তিনি তাঁকে জল থেকে তুলে প্রাসাদে এনে পরিচর্যায় সুস্থ করে তোলেন। ঋষির নাম দীর্ঘতমা। বলির সেবায় তুষ্ট হয়ে ঋষিবর তাঁকে বর দিতে চাইলে তিনি সন্তানহীনতার কথা নিবেদন করেন। কারণ পুত্র পিণ্ডদানম্ অর্থাৎ পিতার মৃত্যুর পর পিণ্ডদান একমাত্র পুত্রই করতে পারে। বলিরাজের প্রার্থনায় সম্মতি দিয়ে ঋষি দীর্ঘতমা রাণীর অঙ্গস্পর্শ করেন এবং আদিত্য তেজ সমন্বিত ৫টি রাজপুত্র জন্মগ্রহণ করে। এদের নাম অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুণ্ড্র ওসুক্ষ। রাজা তাঁদের রাজ্যও নির্দিষ্ট করে দিলেন। অঙ্গ-ভাগলপুর, বঙ্গ-দক্ষিণ ও পূর্ববঙ্গ, পৌণ্ড্র-উত্তরবঙ্গ, কলিঙ্গ-উড়িষ্যা এবং সুক্ষ অর্থে রাঢ় অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গ। ৯ম-১০ম শতাব্দীতে এই রাঢ় দুভাগে বিভক্ত হয়-উত্তর রাঢ় এবং দক্ষিণ রাঢ়।
লক্ষ্মণসেনের সভাকবি ধৌয়ীর 'পবনদূত' কাব্যে প্রচীন সুক্ষের সমৃদ্ধির পরিচয় পাওয়া যায়। 'দশকুমার চরিত'-এ সপ্তগ্রাম ও তাম্রলিপ্ত উভয় বন্দরকেই সুহ্মদেশের অন্তর্ভুক্ত বলা হয়েছে। 'বাঙালীর ইতিহাস' গ্রন্থে ড. নীহাররঞ্জন রায় লিখেছেন 'গঙ্গা-ভাগীরথীর পশ্চিমতীরবর্তী দক্ষিণম্ ভূখণ্ড, অর্থাৎ বর্ধমানের দক্ষিণাংশ, হুগলীর বহুলাংশ এবং হাওড়া জেলাই প্রচীন সুক্ষ জনপদ।' (পৃষ্ঠা-১৪৬)। মহাভারতে উল্লেখ রয়েছে যে রাঢ়দেশে নিষাদ জাতির বাস ছিল। নিষাদ জাতি বলতে কেওরা, হাঁড়ি, ডোম, চণ্ডাল পোদ প্রভৃতি তপশিলী জাতি। সরস্বতী তীরে এরাই প্রথম বসতি শুরু করে।

হরেকৃষ্ণ মহতাবের লেখা 'হিস্ট্রি অফ ওডিষা' তে বলা হয়েছে দ্বাদশ শতকে রামপালের পুত্র কুমার পালের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে উড়িষ্যারাজ অনন্তবর্মণ চোড়গঙ্গ রাঢ় আক্রমণকালে গঙ্গাতীরবর্তী মান্দারের রাজাকে পরাজিত করেন। এই মান্দারই যে হাওড়া জেলার গড়মান্দারণ তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। ১৯০৯ খ্রীষ্টাব্দে প্রকাশিত 'পুরাতন হাওড়া জেলা গেজেটিয়ারের' মতে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে রক্ষিত পঞ্জীর' বিবরণ অনুসারে পরবর্তী উড়িষ্যারাজ অনঙ্গভীমদেব রাঢ়দেশের দামোদর তীর পর্যন্ত রাজ্যবিস্তার করেন, অর্থাৎ উলুবেড়িয়া পর্যন্ত। ২৪ পরগণার গোবিন্দপুরে প্রাপ্ত লক্ষ্মণসেনের তাম্রশাসনে উল্লিখিত রয়েছে বর্ধমানভুক্তি, গঙ্গা ও সমুদ্রের সঙ্গমস্থল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এবং আঞ্চলিক স্তরবিন্যাশে 'বিষয়', মণ্ডল', 'খটিকা', 'চতুরক' এবং 'গ্রাম' এ বিভক্ত ছিল। বর্ধমান ভুক্তির অন্তর্গত কোন এক 'বিড্ডার শাসন' গ্রাম অবস্থিত ছিল পশ্চিম খটিকার অংশ বেতড্ড চতুরকের মধ্যে। সেটি বর্তমানের বেতড় শহর। এছাড়া মধ্যযুগের 'চৈতন্যমঙ্গল: 'চৈতন্যচরিতামৃত', 'মনসামঙ্গল' এবং 'চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে এই জেলার বিভিন্ন গ্রামের উল্লেখ রয়েছে। বেতড়ের অনতিদূরে অবস্থিত আলোচ্য জনপদ এই 'আন্দুল-মৌড়ি' জনপদ।
নামকরণ
'হাওড় শব্দ থেকে 'হাওড়া' শব্দের উৎপত্তি। 'হাওড়' শব্দের অর্থ জলাভূমি বা কর্দমাক্ত জমি। পূর্বে সমগ্র জেলাটি নদী, নালা, খাল, জলা ইত্যাদিতে পরিপূর্ণ ছিল। পণ্ডিতদের আরও অভিমত, এটি পূর্বে সুন্দরবনের অংশ ছিল। তখন প্রবলস্রোতা সরস্বতী। হান্টার সাহেব তাঁর 'Statistical Survey of India' গ্রন্থে বলেছেন, এই নদীর খাত তিনশো বছর পূর্বে কোম্পানী বাগানের সীমান্ত হইতে কালাসাপার সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। টলেমী প্রভৃতি বিদেশী এবং অনেক দেশী লেখকদের বিবরণ থেকে জানা যায়, এই নদীপথে বিশালাকার বাণীজ্যতরী দক্ষিণভারত ও সিংহলে পাড়ি দিত। রেনেল সাহেবের ম্যাপেও এই নদীর বিশালত্বের পরিচয় পাওয়া যায়। শ্রীমন্ত সওদাগর ও অন্যান্য সওদাগরগণ এই পথে বাণিজ্যযাত্রা করতেন। তিনি মাকড়দহে মাকড়চণ্ডীর পূজার প্রচলন করেন। অনেক গবেষক সরস্বতীর যে বর্ণনা দিয়েছেন, তাতে বর্তমান সরস্বতীর নর্দমা রূপ দেখলে বিশ্বাস করবেন না। তাতে বলা হয়েছে এই নদীর পশ্চিম তীরে ছিল মৌড়ি রথতলার বড়খাঁ গাজীর গম্বুজাকৃতি মন্দির এবং পূর্ব তীরে ছিল পুঁইল্যার গোরাচাঁদ পীরের গম্বুজাকৃতি মন্দির। কারণ দুটি মন্দিরেরই গঠনশৈলী একই এবং সমসাময়িক কালে নির্মিত বলেই মনে হয়। তাহলে বোঝা যায় বর্তমান মৌড়ির মজুমদার পাড়া, রায় পাড়া সবই সরস্বতীর গর্ভে ছিল। নানা করণে ধীরে ধীরে নদীর এবং সমসামায়িক কালে নির্মিত বলেই মনে হয়। তাহলে বোঝা যায়, বর্তমান মৌড়ির গড়ে উঠে। অপেক্ষাকৃত উঁচু জমি গুলিতেই জঙ্গল পরিষ্কার করে বসতবাটী গড়ে উঠে। স্রোত কমতে থাকে, চড়া পড়তে থাকে। সেই চড়াতেই খাটাল, দোকান ও বসতবাটি গোড়ে ওঠে। তাই ঝোড়হাট রাজবংশী পাড়ার পর চৌধুরীপাড়া এবং ধীরে ধীরে ঝোড়হাট, মাশিলা, মৌড়ি, প্রশস্থ ইত্যাদি গ্রামে অন্তজ শ্রেণীর লোকেরা (তাপশিলীজাতি) বসবাস শরু করেন। তখনও বেশী উচ্চবর্ণের মানুষের আগমন ঘটেনি এই জনপদে। তাই অন্তজ শ্রেণীর লোকেদের নিয়েই গ্রামের পত্তন ঘটে। আবার এইসব শিকারী শ্রেণীর মানুষ শিকারের খোঁজে কখনও অন্যত্রও চলে যেত। তবে এখানকার বসতিগুলি স্থায়ীভাবেই ঘটে।
বর্তমানে গ্রামের নাম আন্দুল। কিন্তু পূর্বে এ নাম ছিল না। কবিরামের দিগ্বিজয় প্রকাশ গ্রন্থে এর নাম রয়েছে 'পারীন্দ্র'। আবার ঐ গ্রন্থেরই অপর পাশে এই জনপদের নামছিল চান্দুল। উড়িষ্যার পুরীতে চান্দুল নামে একটি মঠ রয়েছে। দত্তচৌধুরী জমিদারদের জনৈক ব্যক্তি উক্ত মঠ নির্মাণ করেছেন বলে শোনা যায়। তাই চান্দুল থেকে বর্ণ বিকৃতি ঘটে আন্দুল হতে পারে। যেমন শ্রীনিবাসকে আনেক বলে চিনিবাস। পারীন্দ্র সম্পর্কে বিশেষ কোন তথ্য পাওয়া যায় না।
তবে গ্রামের নাম 'আন্দুল' হওয়ার পিছনে যে জনশ্রুতি রয়েছে। তা বর্তমানেও বিশেষ জনপ্রিয় এবং এতদঞ্চলের আবাল-বৃদ্ধ বনিতা সেইটিকেই সঠিক বলে দাবী ও গর্ববোধ করেন। কিংবদন্তী, কিংবা জনশ্রুতিও ফেলে দেবার নয়। তারও কিছু মূল্য থাকে। এখানেও হয়েছে তাই। জনশ্রুতিটি নিম্নরূপ-নদীয়ার নিমাইপণ্ডিত সন্ন্যাস গ্রহণের পর গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু নামে খ্যাত হন। তিনি আচণ্ডালে প্রেম বিতরণ করতেন। ভক্তগণ তাঁকে প্রেমাবতার বলে সম্বোধন করতেন। তাঁর সহচর ছিলেন নিত্যানন্দ মহাপ্রভু। উভয়েই কৃষ্ণ নামে সর্বদা মাতোয়ারা হয়ে থাকতেন।

"হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে"।–
এই ষোল নাম বত্রিশ অক্ষর সহযোগে সংকীর্তন করতেন। সে প্রায় ৫০০ বছর পূর্বের ঘটনা। তখন মধ্যযুগ, এদেশে মুসলিম রাজত্ব চলছে। হিন্দুদের অস্পৃশ্যতা, জাতিভেদ ইত্যাদির শিকার হয়ে দলিত হিন্দুরা দলে দলে ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলামধর্ম গ্রহণ করতে শুরু করে। কারণ ইসলাম কথার অর্থ হল শান্তি। সাম্য, মৈত্রী ও সহাবস্থান হল ইসলামের নীতি। উচ্চবর্ণের হিন্দুদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে শান্তির জন্য দলিত হিন্দুগণ ইসলামের আশ্রয়লাভ করতে শুরু করে। গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু দেখলেন এইভাবে চলতে থাকলে হিন্দুধর্মের বিলোপ সাধন ঘটবে। তাই তিনি হিন্দুধর্মের পুনরুত্থানের জন্য জাত হারানো সমস্ত মানুষকে দীক্ষা দিয়ে মুখ এক ধর্মের প্রবর্তন করলেন। সেই ধর্মের নাম হল 'বৈষ্ণব'। বৈষ্ণব কথার অর্থ বিষ্ণুর উপাসক। সব ধর্মের মানুষ, এমনকি মুসলমানেরা পর্যন্ত এই ধর্মে আশ্রয় পেতে থাকেন। যবন হরিদাস তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এইভাবে সকল মানুষকে নিয়ে তিনি সাম্য, মৈত্রী ও ন্যায়ের রাজ্যস্থাপনে উদ্যোগী হলেন। তাঁর এই মহান আদর্শ, ও আচণ্ডালে প্রেম বিতরণ দেখে মাতাল জগাই-মাধাই তাঁকে অন্যের প্ররোচনার হত্যা করতে এসেও তাঁর চরণে ক্ষমা চেয়ে সৎ মন্ত্রে দীক্ষা নিয়ে সমাজের মূলস্রোতে ফিরে আসেন। প্রেম বিতরনই ছিল মহাপ্রভুর মূলমন্ত্র। তিনি নীলাচলে (পুরী) পথে যাত্রা করেন। ভক্ত নিত্যানন্দ গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর সান্নিধ্য লাভের জন্য কামারহাটী, আড়িয়াদহ হয়ে সরস্বত নদী পথে পুরী যাত্রা করেন। কথিত আছে সরস্বতী নদী তীরে আন্দুল অর্থাৎ তৎকালীন পারিন্দ্র গ্রামের জমিদার কৃষ্ণানন্দ দত্তচৌধুরীদের দালানে এক রাত্রি সপার্ষদ তিনি অধিষ্ঠান করেন। জমিদার কৃষ্ণানন্দ খুব ভক্তিমার্গের মানুষ এবং কৃষ্ণভক্ত ছিলেন। নিত্যানন্দ মহাপ্রভুর কাছে তিনি সন্ত্রীক দীক্ষা গ্রহণ করেন। তাঁর দালানে সপার্ষদ নিত্যানন্দ মহাপ্রভু নাম সংকীর্তন শুরু করেন। গ্রামের আপামর মানুষ সেই নাম সংকীর্তনে যোগদান করেন। সকলে কৃষ্ণ নামে বিভোর হয়ে নেচে নেচে সংকীর্তন করতে থাকেন। নৃত্যোথিত ধুলিতে আকাশ বাতাস ভরপুর হয়ে উঠে। সে যেন শুধু ধুলি নয়-আনন্দধূলি। সকলে শ্রদ্ধাবনত চিত্তে সেই ধুলি মস্তকে ধারণ করতে থাকেন। সেন্দ্র আনন্দধূলি থেকেই গ্রামের নাম হয় ‘আন্দুল’। ভাষাতাত্বিক বিচারে, আনন্দ ধুলি আন্ধুলি > আন্দুলি > আন্দুল।
জনশ্রুতির পিছনে কিছু যথেষ্ট যুক্তি ও রয়েছে। কারণ কৃষ্ণনন্দ ছিলেন সফল জমিদার। গ্রাম খানিতে তখন সবে জনবসতি গড়ে উঠেছে। তাই আন্দুল নামের আগমন ৫০০ বছরেরও অধিক কালের। তারও বহুপূর্বে এর নাম চান্দুল এবং পারীন্দ্র নিশ্চয়ই ছিল। কারণ কবিরাম মিথ্যাকথা লিখতে পারেন না। তাহলে গ্রামের পত্তন আরও দু'একশ বছর পূর্বেই নিশ্চয় হয়েছিল। তাতে কোন সন্দেহ থাকতে পারে না। তবে, নিত্যানন্দের আগমনে আনন্দধূলি থেকে যে আন্দুল নাম বিশ্বাসযোগ্য, তার প্রমাণ স্বরূপ আরও বলা যায়, পরদিন নিত্যানন্দ মাহাপ্রভু যখন সপার্ষদ সংকীর্তন নিয়ে এখান থেকে বিদায় গ্রহণ করেন, তখন পার্শ্ববর্তী গ্রামের মা-বোন ও আপামর জনগণ পাদ্য অর্থ ও শংখধ্বনি দিয়ে তাঁদের বরণ করে নেন। তাই, সেই গ্রমের নাম হয় শাঁকরাইল। শংখরোল > শাঁখরোল শাঁখরাইল> শাঁকরাইল। অতএব, নিত্যানন্দ মহাপ্রভুর আগমনের প্রমাণ আজও রয়েছে।
দক্ষিণের নবদ্বীপঃ
প্রায় তিনশো বছর পূর্বে এখানকার পণ্ডিত রঘুনাথ তর্কবাগীশের বংশে ভৈরবীচরণ বিদ্যাসাগর নামে এক পণ্ডিতের আবির্ভব ঘটে। তিনি ছিলেন একজন তন্ত্র সাধক সরস্বতী নদীর তীরে গর্ভগৃহে পঞ্চমুন্ডীর আসনে তিনি তন্ত্র সাধনা করতেন।
তৎকালীন দিনে এতদঞ্চলে ৩২-৩৪ খানি চতুষ্পাঠী ছিল। সেই সব চতুষ্পাঠীয় পণ্ডিতদের মধ্যে প্রায়ই তর্কযুদ্ধের আসর বসত। ভৈরবীচরণ সেইসব তর্কযুদ্ধে বরাবরই সকলকে পরাজিত করতেন। তাই, আন্দুলের পণ্ডিত সমাজ তাঁকে 'তর্কালংকার' উপাধিতে ভূষিত করেন। এতে ভৈরবীচরণ খুব গর্ব অনুভব করেন। ফলে তাঁর অন্তরে অহংকারও জাগরিত হতে থাকে।
তাৎকালীন দিনে নদীয়ার নবদ্বীপের অধিপতি ছিলেন মহারাজা শিবচন্দ্র (মতান্তরে কৃষ্ণচন্দ্র)। তিনি ছিলেন খুব বিদ্যোৎসাহী এবং জ্ঞানী গুণীর পৃষ্ঠপোষক। তিনি প্রায়শই তাঁর রাজসভায় পণ্ডিত সভার আয়োজন করতেন। সারা ভারতবর্ষের বিদগ্ধ পণ্ডিতদের সমাবেশ ঘটত সেই সভায়। আন্দুলে তখন দত্তচৌধুরীদের সুবর্ণযুগ। এমনই এক পণ্ডিত সভার আয়োজন করে নবদ্বীপাধিপতি উক্ত পণ্ডিত সভায় প্রতিনিধি প্রেরণের জন্য জমিদার কাশীশ্বরের নিকট (মতান্তরে হরিশ্চন্দ্র) দূত মারফৎ আমন্ত্রণ দেন। কাশীস্বর তাৎকালীন আন্দুলের শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত ভৈরবীচরণকে প্রতিনিধি হিসাবে উক্ত পণ্ডিত সভায় প্রেরণের ব্যবস্থা করেন। ভৈরবীচরণ তখন খুবই নবীন। তাই নবদ্বীপরাজের কাছে নিজ পণ্ডিতদের উচ্চাসনের পরিবর্তে তাঁকে স্থান দেওয়া হয় ধূলিধূষরিত কুশাসন। তিনি এই ব্যাভারে ক্ষুব্ধ হয়ে এর কারণ জানাতে চাইলে তাঁর উত্তরে বলা হয়, প্রবীন এবং শ্রেষ্ঠ পণ্ডিতদের জন্য উচ্চাসন। আর অর্বাচীনদের কুশাসন। তখন তিনি ক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং বললেন, 'যদি আমি তর্কযুদ্ধে সকলকে পরাজিত করতে পারি, তাহলে এই কুশাসেনের ধূলি সকলের মস্তকে নিক্ষেপ করব।' তার কথা শুনে সেই সকল পণ্ডিত বর্গ তাচ্ছিল্ল সুরে বলেন, 'তথাস্তু'।
যাই হোক, উক্ত পণ্ডিত সভায় ভৈরবীচরণ একে একে সকলকে তর্কযুদ্ধে পরাজিত করে শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত বলে বিবেচিত হন। এবং পূর্বের অপমানের প্রতিশোধ গ্রহণ এবং পূর্বপ্রতিশ্রুতিমত কুশাসনের ধূলি সমস্ত পণ্ডিতের মস্তকে নিক্ষেপ করেন। তাঁরা ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁকে অভিসম্পাৎ করেন।
তবে যাই হোক, মহারাজ প্রীত হয়ে তাঁকে পুরস্কার প্রদানের ইচ্ছা প্রকাশ করলে তিনি বিনয়ের সাথে বললেন, 'আমি সারা অন্দুলবাসীর প্রতিনিধি। তাই, পুরস্কার যদি দিতেই হয়, তাহলে আমাকে নয়, আন্দুলবাসীকে পুরস্কারে ভূষিত কুরুন।' বিনয়ের এই আবেদন শুনে মহারাজ আরও সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে 'বিদ্যাসাগর' উপাধি এবং অন্দুলকে 'দক্ষিণের নবদ্বীপ' খেতাবে ভূষিত করেন। ভৈরবীচরণ সানন্দে সেই খেতাব মস্তকে ধরণ করেন এবং তখন থেকে আন্দুলের নাম হয় 'দক্ষিণের নবদ্বীপ'।
এক্ষণে মৌড়ি বা মহিয়াড়ির নামকরণ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা প্রয়োজন মহিয়াড়ী কথার কথার ব্যুৎপত্তি গত অর্থ হল- 'মহি (মাটি) আড়া (উঁচুপাড়)
প্রত্যয়'। অর্থাৎ মাটির উঁচু বাঁধ। সরস্বতী নদীর পলি জমে কোথাও কোথাও উঁচু পাড়ের সৃষ্টি হয়। এটি তার মধ্যে অন্যতম। সেই উঁচু বাঁধে শিকারী, জেলে, কৈবর্ত, বর্গক্ষত্রিয়, দুলে ইত্যাদি শ্রেণীর মানুষের বাসবাস গড়ে উঠে। পরবর্তীকালে এখানে রায়চৌধুরী মল্লিক, কররায় পদবীর এবং তার কিছুকাল পরে কুণ্ডচৌধুরী পদবীর জমিদারদের আগমন ঘটে। স্বভাবিক ভাবেই ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, নাপিত ইত্যাদি সব শ্রেণীর মানুষদের ভূমিদান করে জমিদারগণ আনয়ন করেন। ফলে এই গ্রামটিও জনবহুল হয়ে পড়ে ধীরে ধীরে। তবে আন্দুলের অনেক পরে মৌড়ির সভ্যতার বিকাশ ঘটে। যথাস্থানে বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হবে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে আরও ১০/১২টি গ্রাম। সকলের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া সম্ভব না। সকলকে নিয়েই আন্দুল মৌড়ি জনপদ। সেই জনপদের কৃষ্টি, সভ্যতা, সংস্কৃতি ও ঘটনাবলীর বিবরণই হল আমাদের আলোচ্য বিষয়।



Comments